বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৩ নভেম্বর প্রকাশিত বুলেটিন অনুযায়ী গত বছর দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ, যা এ বছর কমে দাঁড়াবে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে। অর্থাৎ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংক আরো জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৬ শতাংশ। তবে প্রশ্ন দাঁড়ায়, এ বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় গেল এবং কারা নিল? বিষয়টি এরই মধ্যে গণমাধ্যমেও প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন, তারা অবশ্যই এ অর্থের উৎস অনুসন্ধান করবেন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনবেন। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের গ্রহণ করা নীতিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে সুদহার বেড়েছে, যা বেসরকারি খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। বর্তমানে ব্যাংক ঋণপ্রবাহ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ শতাংশে। শিল্পায়নের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ট্রেডিংকেন্দ্রিক অর্থনীতি হওয়ায় দেশে নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না। গত বছর ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি কমেছিল, আর এ বছর তা আরো কমেছে।
শিল্পায়নের এ নিম্নগতির কারণে গত এক বছরে চাকরি হারিয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ। যারা একসময় কোথাও কর্মরত ছিলেন, তারা এখন জীবিকার সংস্থান না করতে পেরে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। এর মধ্যে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান, প্রায় আট লাখ বিদেশে যান এবং প্রায় ১০ লাখ বেসরকারি খাতে কাজ পান। বাকিরা বেকার থাকেন। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্ব দ্রুত বাড়ছে।
সরকার বর্তমানে রাজস্ব আয়ে তার ব্যয় নির্বাহ করতে পারছে না। ফলে ব্যাংক ঋণ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে। সরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ২৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিতে এসবের পাশাপাশি কিছু ইতিবাচক বিষয়ও রয়েছে। রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। ওয়েজ আর্নার্স ইনকামে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৬ শতাংশ। তবে বাকি প্রায় সব অর্থনৈতিক সূচকই নেতিবাচক।
বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট। আমাদের গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে ৭ দশমিক ৮০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। প্রতি বছর প্রয়োজন ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর ৩০ শতাংশ আমদানি করতে হয়, বাকিটা আসে রিজার্ভ থেকে। কিন্তু এতে রিজার্ভ বছরে প্রায় ৯ শতাংশ হারে কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ছয়-সাত বছরের মধ্যেই গ্যাস রিজার্ভ ফুরিয়ে যাবে। তখন আমাদের পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হতে হবে। এ পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।